Main Menu

হারিয়ে যাচ্ছে কেরাণীগঞ্জের হলুদিয়া পাখী সিরাজুল ইসলামের স্বৃতি

কেরাণীগঞ্জের হলুদিয়া পাখী : কবি সিরাজুল ইসলাম

  1. হাসনাত মুহাম্মাদ আনোয়ার-
    কেরাণীগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকম।

১. আল্লাহু আল্লাহু, তুমি জাল্লেজালালুহু, শেষ করা তো যায়না গেয়ে তোমার গুনগান
২. নবী মোর পরশমনি, নবী মোর সোনার খনী, নবী নাম ভাবে যেজন, সেইতো দো জাহানের ধনী
৩. আমার প্রাণের প্রাণ পাখি, আমার হীরামন পাখি, তোরে কোথায় রাখি পাখিরে.. সবই মিছে আর ফাঁকি ।।
৪. কোকিল ডাকিস না রে আর, এলো বসন্তের বাহার
৫. হলুদিয়া পাখি সোঁনারী বরন পাখিটি ছাড়িল কে? এরকম অসংখ্য জনপ্রিয় গানের গীতিকার ! অথচ তাঁকে আমরা চিনিনা ! তাঁর পরিচয়টাই ভুলে গেছি ! এর চেয়ে লজ্জার কথা আর কি হতে পারে ?

হলুদিয়া পাখি, সোনারই বরণ, পাখিটি ছাড়িল কে ?
কে না শুনেছেন এ গান। কিন্তু যদি বলি এ গানের স্রস্টা কে ?
তাহলে আমাদের অনেকেরই জবাব হবে, জানি না।
আমিও জানতাম না। আজ থেকে পনের ষোল বছর আগে যখন উনি মারা যান, তখন পত্রিকার পাতায় একটা মৃত্যু সংবাদ পড়ে তাঁর সম্পর্কে জেনেছিলাম অল্প বিস্তর। তখনই জেনেছিলাম, শুধু হলুদিয়া পাখি গানটিই নয়, আরো অনেক জনপ্রিয় গানের গীতিকার ছিলেন তিনি।

হলুদিয়া পাখি, সোনারই বরণ, পাখিটি ছাড়িল কে এই গান ছাড়াও আরো অনেক বিখ্যাত গান রয়েছে তাঁর লেখা। যেমন: ১. আল্লাহু আল্লাহু, তুমি জাল্লেজালালুহু, শেষ করা তো যায়না গেয়ে তোমার গুনগান
২. নবী মোর পরশমনি, নবী মোর সোনার খনী, নবী নাম ভাবে যেজন, সেইতো দু জাহানের ধনী
৩. আমার প্রাণের প্রাণ পাখি, আমার হীরামন পাখি, তোরে কোথায় রাখি পাখিরে.. সবই মিছে আর ফাঁকি ।। ৪. কোকিল ডাকিস না রে আর, এলো বসন্তের বাহার, সুখ বসন্ত সুখের কালে বন্ধু নাই ঘরে আমার ।।

পল্লীগীতির মুকুটহীন সম্রাট আব্দুল আলীম ও অন্যান্য শিল্পীর কন্ঠে এ গান গুলো বাংলার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল এক সময়। এ ছাড়াও তাঁর লেখা ৫. তোমার দুহাত ছুয়ে শপথ নিলাম, থাকবো তোমারই ওগো কথা দিলাম ।। এ আধুনিক গানটি আজাদ রহমানের সুরে শিল্পী খুরশিদ আলমের কন্ঠে আসাধারণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এই গানটি গেয়েই (১৯৬৭ খৃ:) খুরশীদ আলম বিখ্যাত হয়ে উঠেন।

এতগুলো জনপ্রিয় গানের গীতিকার ! অথচ তাঁকে আমরা চিনিনা ! তাঁর পরিচয়টাই ভুলে গেছি ! এর চেয়ে লজ্জার কথা আর কি হতে পারে ?

সম্প্রতি এ গীতিকার সম্পর্কে লিখতে গিয়ে তাঁর সম্পর্কে কোন তথ্যই খুঁজে না পেয়ে নিজ উদ্যোগে কিছু তথ্য সংগ্রহে সচেষ্ট হই। অনেক খোঁজাখুঁজির পর অন লাইনে একটি পেইজে কিছু তথ্য পাই। কিন্তু সেখানে তাঁর জন্মসাল লেখা থাকলেও মৃত্যুসাল লেখা ছিলনা। তবে জন্মস্থান লেখা থাকায় কিছুটা আশ্বস্থ হই। কবি সিরাজুল ইসলাম, জন্ম: ২রা সেপ্টেম্বর ১৯৩০ খৃ:। জন্মস্থান: জিঞ্জিরা, কেরাণীগঞ্জ, ঢাকা । শুধু এতটুকু ঠিকানা সম্বল করে সিদ্ধান্ত নেই, ঐ ঠিকানায় গিয়ে খোঁজ নিতে হবে। অপেক্ষায় থাকি, যখন ইংল্যান্ড থেকে বাংলাদেশ সফরে যাবো, তখনই যাবো ঐ ঠিকানায় ।

১৪ই এপ্রিল (২০১৭ খৃ:) শুক্রবার ঢাকাসহ সারাদেশে চলছে বৈশাখী মেলা। ঐদিন ভোরে ইংল্যান্ড থেকে ঢাকা পৌঁছি। দীর্ঘ সফর আবার এদিকে মেলার কারণে ঐদিন আর আমার প্রিয় ‘হলুদিয়া পাখি’র খোঁজ নেয়া সম্ভব হয়নি। পরদিন শনিবার বুড়িগঙ্গা পার হয়ে জিঞ্জিরা বাজারে পৌছলাম। সেখান থেকে অনেক খোঁজাখুঁজির পর পৌছলাম রসুলপুর , কবির বাড়ি ।

ততক্ষণে মাগরিবের আজান শোনা যাচ্ছে মসজিদের মিনার থেকে। তার মানে ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসছে। কবির বাড়ীর সবকিছু ঘুরে দেখা কঠিন হবে এ অন্ধকারে। আর ছবি তোলা গেলেও এ অন্ধকারে ছবি কতটুকু স্পষ্ট আসবে, তাও ঠিক বলা যাচ্ছেনা !

বাড়ীর প্রবেশ মূখেই হলুদ রঙের ছোট্ট এক দালান। বহির্দেয়ালে তারকা সদৃশ ফুল আঁকা। দালানের শীর্ষদেশে লেখা রয়েছে- কবি সিরাজুল ইসলাম, বই বাগান । বই বাগান ! অর্থাৎ লাইব্রেরী বা পাঠাগার। তখনও সন্ধ্যার অন্ধকারে পুরো আকাশ ছেয়ে যায়নি । ঝটপট শুরু করলাম ছবি তোলা। ছবি তোলা দেখে এক পথচারী এগিয়ে এলেন।

সালাম দিলাম। বললেন, বহুদিন পর কাউকে এভাবে ছবি তুলতে দেখলাম, ভালই লাগছে। আজকাল আর কেউ আসেনা। এদিকে বাড়ির ভেতরে লোকজনের চলাফেরা দেখা গেলেও আমাদের দেখে কেউ এগিয়ে এলেন না ! হয়তোবা সন্ধ্যাবেলা বলেই, বাড়ীতে তেমন কেউ নেই। বেশ ডাকাডাকির পর এক তরুণ এগিয়ে এলো। কবি সিরাজুল ইসলামের দ্বিতীয় ছেলের সন্তান, তুহীন । তাকে আমাদের যাওয়ার উদ্দেশ্য বললাম। সে বললো, বয়স্ক কেউ বাড়িতে নেই।

তার বাবা অর্থাৎ সিরাজুল ইসলামের একমাত্র জীবিত ছেলে নদীর ওপারে ব্যবসা করেন। তিনি দোকানে রয়েছেন। কবির সেই ব্যবসায়ী ছেলের স্ত্রী বাড়ীতে আছেন। উনাকে ডেকে আনলাম। ভদ্রমহিলা তার স্বামীর মোবাইল নাম্বার দিলেন। তাকে ফোন দিয়ে বললাম আমি সিলেট থেকে এসেছি। কবি সম্পর্কে জানতে চাই। তিনি বাড়ী চলে আসতে রাজী হলেন না। অথবা তার দোকানেও যেতে নিষেধ করলেন। বললেন, ব্যস্ত আছেন, আগামী শুক্রবার যেতে বললেন।

তার কথায় কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ পেলো। বললেন, কী দরকার এসব দিয়ে ! আরো বললেন- উপজেলা সদরে কবির নামে একটা পাঠাগার ছিলো, সেটাও গত দশ বছর ধরে পুলিশ ফাঁড়ি হয়ে আছে, কাকে কি বলবো ? সরকারের প্রশাসনই যখন রক্ষক হওয়ার পরিবর্তে ভক্ষকে পরিনত হয়েছে তখন আর এসব তথ্য সংগ্রহ করে কী হবে। বাদ দেন এসব। এই বলে ফোন রেখে দিলেন !

উপায় না দেখে তার স্ত্রীকে অনুনয় বিনয় করে বললাম: আপা, আমরা সিলেট থেকে এসেছি। আগামীকালই চলে যেতে হবে। আমরা কবি সাহেবের স্ত্রীকে দেখতে এবং কবি সাহেব সম্পর্কে জানতে চাই। ভদ্রমহিলার দয়া হলো। কবির নিজ হাতে গড়া ‘বই বাগান’ অর্থাৎ পাঠাগারের দরজা খুলে দিলেন।

তখন বাড়িতে মেহমান কবির বেগম সাহেবা
আয়েশা খাতুনের বোন তাঁকে দেখতে এসেছেন। কবিপত্নী বার্ধক্য জনিত রোগে শয্যাশায়ী। পাঠাগারের দুটি কক্ষ। প্রথমটিতে আলমারীতে বেশ কিছু বই রাখা আছে। তবে অন্ধকারে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। ভাগিনা সুমন মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে ক’টি বই বের করে আনলো। ধুলোবালি ঝেড়ে পেয়ে গেলাম- হলুদিয়া পাখি ।

কবির লেখা আরো কিছু গানের বই পাওয়া গেল। হলুদিয়া পাখি হাতে নিয়ে পাশের কক্ষের দিকে এগিয়ে গেলাম। কবি পত্নী সে কক্ষেই শুয়ে আছেন। পাশেই তাঁকে দেখতে আসা তাঁর বোন। সালাম দিলাম দুজনকে। টুকটাক কুশল বিনিময় করে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলাম।

কবির পুত্রবধুর সাথে কবির জীবন নিয়ে কিছু কথা হলো। শেষ পর্যায়ে আমার হাতে কবির বই দেখিয়ে বললাম বইগুলো কি নিতে পারি ? যদি চান তবে দাম দিয়ে দেবো। তিনি বললেন, দাম দিতে হবেনা। নিতে চান তো নিয়ে যান। তবে আমার শ্বাশুড়ীর অনুমতিটা নিতে হবে। তিনিই তাঁর ছেলে তুহীনকে পাঠালেন অনুমতির জন্য। তুহীন ফিরে এসে বললো। হ্যাঁ, নিয়ে যান।

হলুদিয়া পাখি, সোনারই বরণ, পাখিটি ছাড়িল কে ?
বিখ্যাত এই গানের স্রস্টা কবি সিরাজুল ইসলাম ১৯৩০ খৃ: ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে অবস্থিত জিঞ্জিরার পাশের গ্রাম রসুলপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম নূর ইসলাম। মা বাবার বড় সন্তান কবি সিরাজুল ইসলাম, সরকারের ইনকাম ট্যাক্স বিভাগের চাকুরীজীবি ছিলেন।দুই ছেলে এবং দুই মেয়ের জনক ছিলেন তিনি ।

খুবই ভাবগম্ভীর, ধ্যানী ও স্বল্পবাক গভীর চিন্তার লোক ছিলেন কবি সিরাজুল ইসলাম। অসংখ্য জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা কবি সিরাজুল ইসলামের মোট উনিশটি কবিতা ও গানের বই প্রকাশিত হয়েছে বলে জানালেন মরহুমের দৌহিত্র নাজিম উদ্দিন রাসেল।

কবির বাড়ী সফর কালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত পাঠাগারে মাত্র কয়েকট গানের বই দেখতে পাই। যে বইগুলো দেখেছি সেগুলো সাইজের দিক দিয়ে মাঝারি আকারের বই। অর্থাৎ গড়ে একশত বা এর চেয়ে কম পরিমান গান প্রত্যেকটা বইয়ে রয়েছে বলে অনুমান করি। এই উনিশটি বইএর সবগুলি কারো সংগ্রহে আছে কিনা জানা নেই, যদি থাকে তবে সবগুলি মিলিয়ে একটি অখন্ড সঙ্গীত সমগ্র প্রকাশ করা জরুরী হয়ে পড়েছে।

কবির লেখা গানগুলি সংগ্রহ ও সংরক্ষণে সরকার সহ সুধীমহলের এগিয়ে এসে অবিলম্বেই ব্যবস্থা করা উচিত, নতুবা কবির অপুর্ব সৃষ্টি গানগুলি হারিয়ে যাবে কালের গহীনে।

কবি সিরাজুল ইসলামের জন্ম ২ সেপ্টেম্বর ১৯৩০ খৃ: এবং মৃত্যু ৯ জুন ২০০২ খৃ: । সে হিসেবে কবি ৭২ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। কবি সিরাজুল ইসলাম Kobi Sirajul Islam নামে একটি ফেসবুক পেইজ রয়েছে। পেইজটির এডমিন কবি’র দু’জন দৌহিত্র (নাতি) মিনহাজুল ইসলাম সুখন ও নাজিম উদ্দীন রাসেল।

© 2017, Presslist24.com. <<- প্রথম পাতায় ফিরতে ক্লিক করুন http://www.keranigonj24.com

Facebook Comments





একটি রিপ্লাই দিন

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*

8 + 9 =